চীন–বাংলাদেশ–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর: দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক সম্ভাব্য গেম চেঞ্জার



কূটনীতির দুনিয়ায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্তটি হলো ঝড়ের আগের শান্ত সময়টা।

যখন চারপাশটা অদ্ভুত রকম নীরব থাকে তখন বুঝতে হয় পর্দার আড়ালে এমন কিছু রান্না হচ্ছে যা পৃথিবীর মানচিত্রকে আক্ষরিক অর্থেই পাল্টে দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া এবং চীন সফরের সময়টাতে ঠিক এমন একটি গুমোট এবং রহস্যময় আবহই বিরাজ করছিল পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়। সবার নজর ছিল বেইজিংয়ের দিকে। ওয়াশিংটন থেকে নয়া দিল্লি—সবারই হার্টবিট ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সবাই ভাবছিল তারেক রহমান কি এমন কোনো চুক্তিতে সই করবেন যা চূড়ান্তভাবে ভারতের বিরাট ক্ষতি করবে এবং একই সঙ্গে আমেরিকার মতো পরাশক্তিকেও ক্ষুব্ধ করে তুলবে। ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ তখন হাঁটছিল একটি খাদের কিনারায় অত্যন্ত সরু দড়ির উপর দিয়ে।

সাউথ ব্লক বা নয়া দিল্লিও এই সফরে চরম চাপে ছিল। তারা ঢাকাকে শান্ত রাখার জন্য সফরের ঠিক আগেই একটি ললিপপ বা প্রলোভন ছুড়ে দিয়েছিল। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার হঠাৎ করে ঘোষণা করলেন, ২৮ তারিখ থেকে বাংলাদেশিদের জন্য টুরিস্ট ভিসা চালু হচ্ছে। যে ভারত গত কয়েক মাস ধরে ভিসা বন্ধ করে, সীমান্তে পুশ-ইন করে এবং বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করে ঢাকাকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করছিল, তারা হঠাৎ টুরিস্ট ভিসার দরজা খুলে দিল কেন? কারণ তারা ভয় পাচ্ছিল। তারা চাইছিল ভিসা চালুর এই টোপ দিয়ে তারেক রহমানকে কিছুটা নরম করা যায় কিনা, যাতে তিনি চীনে গিয়ে এমন কিছু না করেন যা ভারতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

বেইজিংয়ের সফর শুরু হলো। প্রথম এক-দুই দিন পার হয়ে গেল। পুরো বিশ্বের মিডিয়া, বিশেষ করে ভারতীয় থিংক ট্যাঙ্কগুলো তীর্থের কাকের মতো বসেছিল ব্রেকিং নিউজের আশায়। কিন্তু কী হলো? সবাই দেখল দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ কিছু এমওইউ বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হচ্ছে। কারও মধ্যেই তেমন কোনো ভাবান্তর নেই। সবাই ভাবল, কোথায় সেই বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা, কোথায় পদ্মা ব্যারেজ, কোথায় দ্বিতীয় যমুনা সেতু বা দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ঘোষণা? এমনকি দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে চীন যে বিশাল কোনো অনুদান বা ঋণ দেবে, তারও কোনো ঘোষণা এলো না।

ভারতীয় মিডিয়াগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করল। তারা ভাবল, যাক বাবা বাঁচা গেল। তারেক রহমান হয়তো ভারতের চাপ আর আমেরিকার ভয়ের কারণেই চীন থেকে খালি হাতে ফিরে আসছেন। সাউথ ব্লকের কর্তারা হয়তো নিশ্চিন্ত মনে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন। কিন্তু তারা জানত না, তারা আসলে এক ভয়ঙ্কর মায়াজালের শিকার হয়েছেন। তারা জানত না, ড্রাগন যখন শিকার করে তখন সে কোনো শব্দ করে না; সে একেবারে শেষ মুহূর্তেই ছোবল মারে।

সফর প্রায় শেষ। ঠিক যেদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের উদ্দেশ্যে বিমানে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই বেইজিংয়ের গ্রেট হল থেকে এমন একটি ঘোষণা ভেসে এলো যা আক্ষরিক অর্থেই পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটালো। একটি বিশাল ঘোষণা—মিয়ানমারকে যুক্ত করে, মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীন–বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক করিডর চালু করা হবে।

মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিশ্বের কূটনৈতিক মহল বুঝে গেল, এটি কোনো সাধারণ কানেক্টিভিটি বা রাস্তাঘাট বানানোর প্রকল্প নয়। এটি একটি গেম চেঞ্জার। অনেকের কাছে মনে হতে পারে, "কী এমন একটা কানেক্টিভিটি? একটা রাস্তা তো!" কিন্তু না।

এই কানেক্টিভিটি মানে হলো মিয়ানমার হয়ে সোজা চীন, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামের এক বিশাল দুয়ার বাংলাদেশের জন্য খুলে যাওয়া। বাংলাদেশ এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে স্থলপথে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মিয়ানমারকে ব্যবহার করে চীনের সঙ্গে যে সরাসরি পথ তৈরি হতে যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক লাফে আসিয়ান এবং পূর্ব এশিয়ার বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে দেবে।

এই করিডোরের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়। যুক্তি দেওয়া হয়, মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের ওপর চীনের প্রভাব থাকায় করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গেলে চীন রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

এছাড়া দাবি করা হয়, এই করিডোর বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য পথ তৈরি করবে, ভারতের ওপর স্থল বাণিজ্য নির্ভরতা কমাবে এবং আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াবে।

ভিডিওটিতে আরও বলা হয়েছে, করিডোরটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এর কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত গুরুত্বও রয়েছে। চীনের পণ্য ও বিনিয়োগ যদি এই রুট দিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে পৌঁছায়, তাহলে পুরো রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চীনের স্বার্থের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

পরবর্তী অংশে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, সীমান্ত পরিস্থিতি, ভিসা নীতি, তিস্তা প্রকল্প, শেখ হাসিনা সরকারের নীতি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং চীন–বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবি ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। শেষে বলা হয়েছে, এই করিডোর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে এবং বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। 

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.